দেশের ব্যাংকিং খাতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের’ পরিমাণ মোট ঋণের ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ—বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে করা এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই প্রাক্কলন মূলত কারিগরিভাবে ত্রুটিপূর্ণ হিসাবের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে এবং এটি এই খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি বা বাস্তব অবস্থা প্রতিফলন করে না।
আজ বুধবার (১৭ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড পাবলিকেশন্স (ডিসিপি) থেকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে একথা বলা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই পরিসংখ্যান তাদের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট (এফএসআর) ২০২৫’-এর হিসাব পদ্ধতির সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ। তাই এটিকে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকির সঠিক পরিমাপক হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
উক্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে আনুষ্ঠানিক খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার ছিল ৩০.৬0 শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, নিরীক্ষিত (অডিটেড) এবং চূড়ান্তকৃত এই পরিসংখ্যানটিই ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য পরিমাপক।
বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করেছে, দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের কিছু প্রতিবেদনের হিসাবে অন্যান্য তথ্যের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ও অবলোপনকৃত ঋণ সংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনও সংজ্ঞা ছাড়াই শ্রেণিকৃত ঋণের সঙ্গে পুনঃতফসিলকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ যোগ করে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের হিসাব করায় ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে নীতি-নির্ধারক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে ‘দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ’-এর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বা মানদণ্ডভিত্তিক কোনো একক সংজ্ঞা নেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে যেসব ঋণ থেকে কোনও আয় আসে না, অথবা যেসব ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করা হয় না—সেগুলোকে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পুনঃতফসিলকৃত অশ্রেণিকৃত ঋণের ক্ষেত্রে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা হয় বলে সেসব ঋণকে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।
নিজেদের অবস্থানের ব্যাখ্যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, পুনঃতফসিলকৃত ঋণকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কারণ ঋণগ্রহীতারা অনুমোদিত পুনর্গঠন বা রিল্যাক্সেশন ব্যবস্থার আওতায় নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করে থাকেন। এই ঋণগুলো সচল সম্পদ হিসেবেই গণ্য হয়, যা ব্যাংকের জন্য নগদ অর্থ প্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) তৈরি করে।
পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও মনে করিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক হিসাবমান বা অ্যাকাউন্টিং প্র্যাকটিস অনুযায়ী অবলোপনকৃত ঋণগুলোকে ‘অফ-ব্যালেন্স শিটে’ (মূল হিসাবের বাইরে) রাখা হয়। ফলস্বরূপ, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান স্বাস্থ্য মূল্যায়নের সময় এগুলোকে সচল ঋণ পোর্টফোলিওর সাথে যোগ করার কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, অনিরীক্ষিত এবং কারিগরিভাবে ভুল আর্থিক তথ্য প্রকাশের ফলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) মধ্যে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বিভ্রান্তিকর ধারণার সৃষ্টি হতে পারে। এটি শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
এই কারণে আর্থিক খাতের উপাত্ত নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সংবাদ মাধ্যমগুলোকে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করার এবং প্রতিবেদন প্রকাশের আগে আনুষ্ঠানিক উৎস থেকে তথ্য যাচাই করে নেওয়ার জোর আহ্বান জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট (এফএসআর) ২০২৫’ প্রকাশ এবং দেশের ব্যাংকগুলোতে সমস্যাযুক্ত ঋণের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে চলমান নানামুখী আলোচনার মধ্যে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তার মাঝেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই স্পষ্টীকরণটি দেওয়া হলো।






