চলমান যুক্তরাষ্ট্রএক্স-ইরান যুদ্ধবিরতি আলোচনায় ইরান তাদের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম চীনে স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। এই ইউরেনিয়াম বর্তমানে বোমা হামলায় বিধ্বস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে, তবে এটি দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্রে রূপান্তর করার সক্ষমতা রাখে।
বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এবং চীন তা অস্বীকার করেনি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিক্রিয়া থেকে এই সম্ভাবনা রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, “যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই চীন ইরানসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে যোগাযোগ বজায় রেখেছে এবং লড়াই বন্ধ ও শান্তি বজায় রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।”
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, “আমরা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চার দফা প্রস্তাবের বিষয়টি সমুন্নত রাখব এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যত দ্রুত সম্ভব শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করব।”
পরবর্তীতে তারা উল্লেখ করেছে, “ইরানি পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আমরা সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে আমাদের অবস্থান সবসময় বজায় রেখেছি। আমরা আশা করি সকল পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি সমাধানে পৌঁছানোর সুযোগ হবে, যেখানে সবার উদ্বেগের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।”
ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে ভূমিকা রাখতে চায় চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মন্ত্রণালয় বলেছে, “আমরা ইরানি পারমাণবিক ইস্যুর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে ইচ্ছুক। একই সাথে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ব্যবস্থা রক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও আমরা কাজ করতে চাই।”
সামগ্রিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের গন্তব্য হিসেবে চীনের নাম প্রস্তাব করা ইরানের প্রকৃত ইচ্ছা, নাকি এই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি বা তাদের মনোভাব পরখ করার কোনো কৌশল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০১৫ সালের ওবামা আমলের পারমাণবিক চুক্তির অধীনে ইরানের ২০%, ৫% এবং ৩.৬৭% মাত্রার প্রায় সবটুকু মাঝারি ও নিম্নমান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় স্থানান্তর করা হয়েছিল, যা দিয়ে সম্ভবত প্রায় ১০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব ছিল। তবে এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে আস্থার জায়গা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া পারমাণবিক চুক্তির অবসান
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে একগুচ্ছ দ্বিপাক্ষিক পারমাণবিক অস্ত্র চুক্তি কার্যকর ছিল। ওই চুক্তির আওতায় উভয় দেশের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বিদেশী বিশেষজ্ঞ দল উপস্থিত থেকে যৌথ প্রতিশ্রুতিগুলো পালিত হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করত। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে (২০১৭-২০২১) এর কিছু চুক্তি বাতিল হয়ে যায় এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর অবশিষ্ট চুক্তিগুলোও বাতিল হয়ে যাওয়ায় আমেরিকান-রুশ সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে।
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে কখনোই একে অপরের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের এমন ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমানে দুই পক্ষই বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ায় প্রযুক্তি চুরি বা গোয়েন্দাগিরির বিষয়ে একে অপরকে সন্দেহ করে।
সেই অনুযায়ী, চীনে রাখা পারমাণবিক পদার্থের ওপর আমেরিকান বা জাতিসংঘের সংস্থা আইএইএ পরিদর্শকদের স্থায়ী ও অনির্দিষ্টকালের প্রবেশাধিকার বা তদারকি করার গ্যারান্টি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের স্থানান্তর মেনে নেবে কি না তা অনিশ্চিত।
৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলা বা স্থায়ীভাবে কমিয়ে আনা বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই সমস্যার সমাধানে তেহরানের অস্বীকৃতি বা ধীরগতিই ছিল ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের হামলা (যে যুদ্ধের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামান্য অংশগ্রহণ ছিল) এবং ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রাথমিক কারণ।







