ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা ‘এয়ারবাস’ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য তাদের বহরের একটি সংশোধিত প্রস্তাব জমা দিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী বোয়িংয়ের সাথে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির সাম্প্রতিক মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের চুক্তির পর এয়ারবাস তাদের আগের প্রস্তাব কমিয়ে ১০টি উড়োজাহাজে নামিয়ে এনেছে।
এয়ারবাস ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সূত্র জানিয়েছে, ইউরোপীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি বিমানের টেকনো-ফাইন্যান্স কমিটির কাছে একটি নতুন প্রস্তাব পেশ করেছে। এই প্রস্তাবে ৪টি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ এবং ৬টি এ৩২১ নিও ন্যারো-বডি জেটের অফার দেওয়া হয়েছে।
গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সাথে বিমানের ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক দিন পরই এই সংশোধিত প্রস্তাবটি এল। ওই চুক্তির আওতায় বিমান বোয়িং থেকে ৮টি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, ২টি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্সসহ মোট ১৪টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা হিসেবেই এয়ারবাস তাদের আগের প্রস্তাবটি কাটছাঁট করেছে। এর আগে এয়ারবাস ১০টি এ৩৫০ ওয়াইড-বডি জেট এবং ৪টি এ৩২০ নিও ন্যারো-বডি উড়োজাহাজসহ মোট ১৪টি বিমানের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, এয়ারবাস এ৩২১ নিও মূলত এ৩২০ নিও-র একটি দীর্ঘ সংস্করণ, যাতে ১৮০ থেকে ২২০ জন যাত্রী পরিবহন করা যায়।
এয়ারবাসের একটি সূত্র দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছে, “বোয়িং চুক্তির আগে থেকেই আমরা বিমানের সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছি। সংশোধিত প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর আমরা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করেছি।”
গত ৫ মে এয়ারবাসের ভাইস প্রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড ডেলাহে সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানমের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিদা আক্তার এবং বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়সার সোহেল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনাকালে এয়ারবাস বিমানের জন্য একটি মিশ্র বহর কাঠামো তৈরিতে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করে। মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীও ভবিষ্যতে বহর উন্নয়নে এয়ারবাসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এয়ারবাসের একজন মুখপাত্র টিবিএসকে বলেন, “গ্রাহকদের সাথে আমাদের আলোচনা হতে পারে বা না-ও পারে, এমন কোনো বিষয় নিয়ে আমরা মন্তব্য করি না।”
বিমানের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বলেন, এয়ারলাইন্সটি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন উড়োজাহাজ নির্মাতাদের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়ে থাকে। টিবিএসকে তিনি বলেন, “একজন গ্রাহক হিসেবে আমরা নির্মাতাদের সাথে সম্পৃক্ত হই কারণ আমাদের উড়োজাহাজ প্রয়োজন। কিন্তু প্রস্তাব পাওয়ার মানেই এই নয় যে আমরা অবশ্যই উড়োজাহাজ কিনব।”
এয়ারবাসের এই নতুন তৎপরতা এমন এক সময়ে যখন সরকার ২০৩৪-৩৫ অর্থ বছরের মধ্যে বিমানের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার একটি দীর্ঘমেয়াদী রোডম্যাপ পর্যালোচনা করছে। জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটিকে আধুনিকায়ন এবং বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন ও কার্গো হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টার অংশ এটি। এয়ারবাস সূত্র জানায়, বিমান যদি মিশ্র বহর চালুর সিদ্ধান্ত নেয় তবে কোম্পানিটি ২০৩৩ সালের মধ্যে উড়োজাহাজ সরবরাহ করতে সক্ষম হবে। বিমানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বোয়িং তাদের অর্ডার করা ১৪টি উড়োজাহাজ ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে ১৪টিই বোয়িংয়ের তৈরি।
এয়ারবাস-বোয়িং দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা
বিমানের ভবিষ্যৎ বহর পরিকল্পনা নিয়ে বোয়িং এবং এয়ারবাসের মধ্যে কয়েক বছর ধরে চলা প্রতিযোগিতার মধ্যেই সর্বশেষ বোয়িং চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে। যদিও এয়ারবাস এখন পর্যন্ত বিমানের কাছ থেকে কোনো অর্ডার নিশ্চিত করতে পারেনি, তবে কোম্পানির প্রতিনিধিরা বলছেন যে আলোচনা এখনও সচল রয়েছে এবং তাদের প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়নি।
ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানি সহ বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের কূটনীতিকরাও একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ বিবেচনা করতে বাংলাদেশকে উৎসাহিত করে আসছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বাংলাদেশ সফরের পর ২০২৩ সালে এয়ারবাসের বিষয়টি গতি পায়। সে সময় বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য যৌথ বিবৃতিতে ফ্রেইটার সহ ১০টি এয়ারবাস এ৩৫০ উড়োজাহাজ কেনার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের যুক্তি হলো, বিমানের বহরে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত করলে কার্যক্রম বৈচিত্র্যময় হবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী হবে।
তবে বোয়িং নীতিনির্ধারকদের সাথে দীর্ঘমেয়াদী যোগাযোগ এবং ড্রিমলাইনার, ফ্রেইটার ও ন্যারো-বডি জেটের বিস্তৃত পরিসরের অফার দিয়ে বিমানের বহরে তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক শুল্ক সংক্রান্ত আলোচনার সময় বাংলাদেশ সরকার ২৫টি বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল।
যেহেতু নতুন অর্ডার করা উড়োজাহাজ সরবরাহ হতে কয়েক বছর সময় লাগবে, তাই সরকার তাৎক্ষণিক সক্ষমতা সংকট মেটাতে অন্তর্বর্তীকালীন সমাধানের কথা বিবেচনা করছে। প্রতিমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, “এই রূপান্তরকালীন সময়ে নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করতে আমরা আগামী পাঁচ বছরের জন্য উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করছি, বিশেষ করে ড্রাই লিজিংয়ের মাধ্যমে।”







