দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে নিউমোনিয়ার জটিলতা। হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৫ থেকে ৮ শতাংশের নিউমোনিয়া দেখা দিচ্ছে।
হামে আক্রান্ত শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামজনিত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুহার অনেক ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ পেরিয়ে যাচ্ছে। অপুষ্টি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশুদের মধ্যে এ ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এর সঙ্গে ডায়রিয়া, বমি, মারাত্মক পানিশূন্যতা এবং দেরিতে হাসপাতালে আসার কারণে জটিলতা আরো বাড়ছে। এছাড়া অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের (এএমআর) কারণে অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারানোয় পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে পড়ছে। এদিকে সারা দেশে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল ৮টা পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত দুই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৪৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, দেশে অপুষ্টি, দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং দেরিতে চিকিৎসা নেয়ার প্রবণতার কারণে অনেক শিশুর শরীরে সংক্রমণ দ্রুত জটিল আকার নিচ্ছে। বিশেষ করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুদের শ্বসনতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হামজনিত নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যুর এ উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলন করে ‘বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন’ ও ‘চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, হাম অতিমাত্রায় সংক্রামক রোগ হলেও ৯৫ শতাংশ শিশু সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যায়। মূল বিপদ ওই ৫ শতাংশকে ঘিরে, যাদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা ব্রেইন ইনফেকশনের মতো জটিলতা তৈরি হয়। হামের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিউমোনিয়ার ঝুঁকি আরো বাড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বক্ষব্যাধী বিশেষজ্ঞ ডা. জিয়াউল হক। তিনি জানান, হামজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ শ্বসনতন্ত্র বিকল হয়ে পড়া। শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার জটিলতা অনেক কারণে তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে যাদের পৃষ্টিহীনতা বা অন্যান্য রিস্ক ফ্যাক্টর আছে। নিউমোনিয়া শুধু ফুসফুসকে প্রভাবিত করে না, কখনো কখনো এটি মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকেও আক্রমণ করতে পারে। অনেক শিশু নাড়িতে সংক্রমণ, ডায়রিয়া, বমি বা সিভিয়ার ডিহাইড্রেশন নিয়ে হাসপাতালে আসে, যা জটিলতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পেডিয়াট্রিক পালমোনোলজিস্ট অধ্যাপক রুহুল আমিন বলেন, ‘পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৪ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়। হামের কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিউমোনিয়ার ঝুঁকি আরো বাড়ে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, নয় মাস বয়সে হামের টিকা দিলে প্রায় ৯০ শতাংশ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। তবে নয় মাসের আগে টিকা দিলে সেই কার্যকারিতা কমে যায়। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের বিষয় বিবেচনা করা হতে পারে।
এদিকে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে চার এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আট শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে হামে ঢাকা বিভাগের দুজন, চট্টগ্রাম বিভাগের একজন ও বরিশাল বিভাগের একজন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগের তিনজন, চট্টগ্রাম বিভাগে তিনজন, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের একজন করে শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে মারা গেছে ৩৭৭ শিশু। আর হামে শনাক্ত হয়ে মারা গেছে ৭৪ শিশু।
এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১১১ শিশুর। এ সময়ে সারা দেশে আরো ১ হাজার ১৯২ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, গত ৬০ দিনে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৫৫ হাজার ৬১১। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪০ হাজার ১৭৬ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৬ হাজার ৫৫ জন। অর্থাৎ ৯৯ শতাংশ মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে।
সূত্র: বণিক বার্তা







