কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলে কালবৈশাখীর ঝড় ও বৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। সেইসঙ্গে উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম কম। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন লবণচাষ ও বিপনণের সঙ্গে জড়িত অন্তত ৫০ হাজার মানুষ।
চলতি সপ্তাহে সবশেষ তিন দিনে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ লবণ মঙ্গলবার সন্ধ্যার ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির পানিতে মিশে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক চাষিরা। খারাপ আবহাওয়ার কারণে মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন চাষিরা।
এমন পরিস্থিতিতে লবণ উৎপাদনে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন-বিসিক এর কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া।
বিসিকের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত) কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণের চাষ হয়েছে।
৬ এপ্রিল পর্যন্ত লবণ উৎপাদিত হয়েছে ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ২৭২ টন; যা গত মৌসুমের (একই সময়ে) তুলনায় চার লাখ ৪৯ হাজার টন কম। গত মৌসুমে একই সময় লবণ উৎপাদিত হয়েছিল ১৮ লাখ ২২ হাজার ১৬২ টন। চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ১০ হাজার টন। দেশে লবণের চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার টন।
চলতি মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং, বাহার ছড়া, হ্নীলা, রঙিখালি, ঝিমংখালী, খারাংখালী, মৌলভীবাজার, উপজেলা সদর, নাজির পাড়া, সাবরাং, নয়াপাড়া ও শাহপরীর দ্বীপের বেশকিছু মাঠের লবণ গলে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা ‘বেড বা কাই’ নষ্ট হয়ে গেছে।
বৃষ্টিতে চাষিদের অনেক ক্ষতি হয়েছে জানিয়ে শাহপরীর দ্বীপের লবণ চাষি নুরুল ইসলাম বলেন, “নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে অন্তত সাত থেকে আট দিন সময় লাগবে। বেশি লাভের আশায় দিনরাত পরিশ্রম করছিলাম। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে এসে মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কয়েকশ মণ লবণ পানিতে মিশে গেছে।”
নোয়াপাড়ার লবণ চাষি গিয়াস উদ্দিন বলেন, মঙ্গলবার এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে খালের দুই পাশে ৭০০ থেকে ৮০০ একর মাঠে লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সেইসঙ্গে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদিত লবণ বিক্রিও করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, “এক মণ লবণ উৎপাদন করতে খরচ হয় ৩০০ টাকা আর বিক্রি করতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা। লোকসান দিয়ে আর কত লবণ বিক্রি করব?”
“গত চার মাস লোকসান দিয়ে লবণ বিক্রি করেছি। দাদনের টাকা পরিশোধ করা দূরে থাক, সংসার চালাব কী দিয়ে ভেবে পাচ্ছি না”, বলে আক্ষেপ করেন গিয়াস উদ্দিন।
কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, সম্প্রতি ঝড় ও বৃষ্টিতে কয়েক হাজার একর লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোনা পানি মিষ্টি হয়ে যাওয়ায় পুনরায় উৎপাদনে অতিরিক্ত শ্রম ও জ্বালানি ব্যয় বাড়বে; যা জাতীয় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও শঙ্কা তৈরি করছে।
বর্তমানে মাঠ ও মিল (কারখানা) পর্যায়ে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে ১০ লাখ ৭০ হাজার টন লবণ মজুদ রয়েছে বলে জানান তিনি।
বেসিক টেকনাফ লবণ কেন্দ্রের প্রধান মিজানুর রহমান বলেন, চাষিদের আবার লবণ তুলতে ১০ দিন সময় লাগবে। লবণ মৌসুম শুরু থেকে এ পর্যন্ত টেকনাফে চার হাজার ৫৫০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার টন।
আবহাওয়া ভালো থাকলে আগামীতে আরও কিছু লবণ উৎপাদন করতে পারলে চাষিরা ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবেন বলে মনে করেন তিনি।







