জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো, ব্যয় সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে দেশগুলো। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ খাতে দ্রুত অগ্রগতি দেখা গেলেও বাংলাদেশ এই দৌড়ে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকা সত্ত্বেও সৌরশক্তি কাজে লাগানোর উদ্যোগ সীমিত, যা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে বড় একটি অপূর্ণ সম্ভাবনা।
বিশ্ব পরিস্থিতিও এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর সঙ্গে সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এতে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো অনিশ্চয়তায় পড়লেও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এগিয়ে থাকা দেশগুলো তুলনামূলক স্বস্তিতে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩০ শতাংশের বেশি আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। চীন একাই গত পাঁচ বছরে সৌরবিদ্যুতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে, যা প্রায় অন্যান্য সব দেশের মোট বিনিয়োগের সমান। ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। একইভাবে ভিয়েতনাম মাত্র চার বছরে শূন্য থেকে ১৭ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে পৌঁছেছে। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানও এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। এমনকি কম সূর্যালোকপ্রাপ্ত ইউরোপেও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ-এর মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট হলেও নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ মাত্র প্রায় ১ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। বাস্তবে এই পরিমাণ আরও কম বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। মোট চাহিদার ৫ শতাংশেরও কম নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, যেখানে ভারতে এই হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত বাংলাদেশের জন্য একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সময় আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর। এতে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
দেশে ইতোমধ্যে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন ও নিত্যপণ্যের বাজারে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এর একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় ৪ কোটি পরিবারের মধ্যে অন্তত ৪১ শতাংশ পরিবার তাদের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে পারে। এতে প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
এছাড়া সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতেও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। কৃষিখাতেও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে বড় অঙ্কের ডিজেল আমদানি সাশ্রয় সম্ভব। বর্তমানে দেশে ১২ লাখের বেশি ডিজেলচালিত সেচপাম্প থাকলেও সৌরচালিত পাম্পের সংখ্যা মাত্র কয়েক হাজার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতকে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা, ভর্তুকি ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা। ছাদভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পখাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং কৃষিতে সৌরচালিত প্রযুক্তির বিস্তার ঘটাতে পারলে দেশের জ্বালানি খাত নতুন রূপ পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎই সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও টেকসই সমাধান। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা থাকলে দেশের লাখো ছাদই একসময় বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে যা শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করবে।







