চট্টগ্রামে ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যেই আবারও আলোচনায় সার্ভেয়ার মো. আবু ইউসুফ ইফতেখার। সর্বশেষ বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের জারি করা বদলি আদেশে তাকে অন্য জেলায় সংযুক্ত করা হলেও বাস্তবে তিনি আগের অবস্থানেই সক্রিয় রয়েছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।গত ১৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা থেকে জারি করা অফিস আদেশে (স্মারক: ০৫.৪২.২০০০.০০০.০৩১.০২.০০০১.২৪.২২৯) তিনজন সার্ভেয়ারকে বদলি করা হয়। সিনিয়র সহকারী কমিশনার (রাজস্ব) গোলাম মুস্তাফা মুন্না স্বাক্ষরিত ওই আদেশে মো. আবু ইউসুফ ইফতেখারকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ. শাখা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ. শাখায় সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং আদেশটি “অবিলম্বে কার্যকর” বলেও উল্লেখ করা হয়। বাকি ২জন বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করলেও আবু ইউসুফ করেননি।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বদলির নির্দেশের পরও তিনি কার্যত চট্টগ্রামের এলএ শাখার প্রভাব বলয়েই অবস্থান করছেন। এতে করে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল কাগুজে বদলি, নাকি প্রভাবশালী কোনো চক্রের কারণে বাস্তবায়ন থমকে আছে?
অভিযোগ রয়েছে, বহদ্দারহাটের বাড়াইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত সংযোগ খাল খনন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের সময় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে, যেখানে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চাষযোগ্য পতিত জমিকে বসতভিটা, দোকান ও স্থাপনা হিসেবে দেখিয়ে কয়েকগুণ বেশি ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে। প্রায় ২৫.২৩৫ একর জমির বিপরীতে ১ হাজার ৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকার এ প্রকল্পে শত শত কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ বণ্টনের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কিছু কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার ও মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের একটি চক্র সক্রিয় ছিল। ওই চক্রের সঙ্গে আবু ইউসুফ ইফতেখারের নামও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে বলে দাবি করেন একাধিক ভুক্তভোগী। যদিও নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে অনিচ্ছুক।
এমনকি একটি টেলিভিশন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত অনিয়মের ঘটনায় তার নাম উঠে এসেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। অতীতে এলএ শাখায় ঘুষ লেনদেন, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ নতুন নয়—২০১৪ সালে ঘুষের অর্থসহ একজন আটক হওয়ার ঘটনাও সেই চিত্রকে স্পষ্ট করে।তবে আবু ইউসুফ ইফতেখারসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন—এমনটাই জানা গেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে। তাদের দাবি, সব কার্যক্রম আইন ও বিধিমালা মেনেই সম্পন্ন হয়েছে।
সুশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বারবার অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাদের ক্ষেত্রে শুধু বদলি নয়—স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই জরুরি। বিশেষ করে বদলি আদেশ কার্যকর না হয়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একই জায়গায় প্রভাব বজায় রাখেন, তাহলে তা প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে আনে।
সচেতন নাগরিক সমাজ বলছেন, চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বড় বাজেটের ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্পে যদি একই ব্যক্তিদের ঘিরে বারবার অভিযোগ ওঠে এবং বদলি আদেশও কার্যকর না হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষুণ্ন করে না—বরং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।







