আমেরিকার অবরোধ অগ্রাহ্য করার অভিযোগে ইরানের একটি কার্গো জাহাজ মাঝসমুদ্রে আটক করেছে মার্কিন বাহিনী। রোববার এই ঘটনার পরই কড়া ভাষায় পাল্টা জবাব হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে চলা যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও হোঁচট খেয়েছে। মঙ্গলবার চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। তার আগে আমেরিকার প্রস্তাবিত দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে রাজি হয়নি ইরান।
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা এই অবরোধের জেরে বিশ্ববাজারে বেড়ে যাওয়া তেলের দাম না কমার সম্ভাবনাই বেশি।
যুদ্ধবিরতির সময় ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ অব্যাহত রেখেছে আমেরিকা। এর জবাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পর ফের বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রোববার ইরানি পতাকাবাহী ওই জাহাজটি যখন বন্দর আব্বাসের দিকে যাচ্ছিল, তখন সেটিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। পরে জাহাজটির দখল নেয় আমেরিকা। সমাজমাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, ‘জাহাজটি এখন পুরোপুরি আমাদের হেফাজতে। ওটাতে কী রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
ইরানের সেনাবাহিনী বলেছে, জাহাজটি চীন থেকে ফিরছিল। দেশটির সরকারি সংবাদমাধ্যমে একজন সামরিক মুখপাত্র বলেছেন, ‘অচিরেই আমেরিকার এই সশস্ত্র জলদস্যুতার জবাব দেবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।’
আমেরিকার অবরোধ, হুমকি দেওয়া বক্তব্য, ওয়াশিংটনের ঘনঘন অবস্থান বদল ও ‘মাত্রাতিরিক দাবি’র জেরে দ্বিতীয় দফায় শান্তি আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি বলে জানিয়েছে ইরানের সংবাদমাধ্যম।
ইরানের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদরেজা আরিফ সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘একতরফাভাবে ইরানের তেল রপ্তানি আটকে রেখে অন্যদের জন্য নিরাপত্তার পরিবেশ আশা করা যায় না। হয় সবার জন্য তেলের মুক্ত বাজার থাকবে, নয়তো প্রত্যেককেই এর চড়া মাশুল গুনতে হবে।’
এর আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, আমেরিকার শর্ত না মানলে ইরানের প্রতিটি সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
জবাবে তেহরান বলেছে, তাদের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা হলে তারা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি শোধনাগারগুলোতে হামলা চালাবে।
যুদ্ধের এই টানাপড়েনের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। সোমবার এশিয়ার বাজারের লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৬.৮৫ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার্সের পতন হয়েছে প্রায় ০.৯ শতাংশ।
বৈঠক ঘিরে অনিশ্চয়তা, তবু চলছে প্রস্তুতি
ট্রাম্প বলেছেন, দু-সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক এক দিন আগে, সোমবার সন্ধ্যায় তার বিশেষ দূতেরা ইসলামাবাদে পৌঁছবেন।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা এর আগে বলেছিলেন, মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। প্রথম শান্তি বৈঠকেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ওই দলে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তার জামাতা জ্যারেড কাশনারও থাকবেন। তবে এবিসি নিউজ ও এমএস নাউ-কে ট্রাম্প আলাদাভাবে বলেছেন, ভ্যান্স প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যাচ্ছেন না।
এই শান্তি প্রক্রিয়ায় প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকা পাকিস্তান অবশ্য বৈঠকের জোর প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে।
পাকিস্তানের দুটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধি দলের জন্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও বেশ কিছু গাড়ি নিয়ে রোববার বিকেলে একটি পাক বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেছে আমেরিকার দুটি বিশাল সি-১৭ কার্গো বিমান।
রাজধানী ইসলামাবাদের পৌর কর্তৃপক্ষ শহরে গণপরিবহণ ও ভারী পণ্যবাহী যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। গত সপ্তাহের বৈঠক যে সেরেনা হোটেলে হয়েছিল, তার চারপাশে বসেছে কাঁটাতারের বেড়া। সমস্ত অতিথিকে দ্রুত হোটেল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দৃশ্যত এই কূটনৈতিক টানাপড়েনের জেরে উইকএন্ডের ছুটির পর বাজার খুললেই বিশ্বজুড়ে তেলের দাম ফের একদফা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের জেরে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে কার্যত ঐতিহাসিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে হু হু করে বাড়ছে তেলের দাম।







