যুদ্ধের টান টান উত্তেজনার মধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হঠাৎ করে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি, আর এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে পাকিস্তান। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটে ইসলামাবাদ নিজেকে কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
আর এটিকে একদিকে যেমন পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এই মধ্যস্থতার পেছনের বাস্তবতা, সম্পর্কের জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে এখন নানা প্রশ্নও সামনে আসছে।
বার্তাসংস্থা এএফপি বলছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং যুদ্ধ শেষের লক্ষ্যে আলোচনার আয়োজন করতে গিয়ে পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বুধবার (৮ এপ্রিল) পরমাণু অস্ত্রধারী এই দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, তার সরকারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা ‘সব জায়গায়’ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
তিনি বলেন, দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি ইতোমধ্যেই কার্যকর হয়েছে এবং এবার এ বিষয়ে পাকিস্তানের রাজধানীতে উভয়পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হবে।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ইরানই প্রথম পাকিস্তানকে স্বীকৃতি দেয়। পরে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর পাকিস্তানও ইরানকে স্বীকৃতি দেয়। এছাড়া ওয়াশিংটনে যেখানে তেহরানের কোনও দূতাবাস নেই, সেখানে পাকিস্তান ইরানের কিছু কূটনৈতিক স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। গত বছর কাশ্মীরে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় আসিম মুনির সামরিক পোশাকের বদলে পশ্চিমা ব্যবসায়িক পোশাকে শেহবাজ শরিফের সঙ্গে ওয়াশিংটন সফর করেন।
শেহবাজ শরিফ সেসময় ট্রাম্পের ‘সাহসী ও দূরদর্শী’ হস্তক্ষেপের প্রশংসা করেন। আর আসিম মুনির বলেন, দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে উত্তেজনা থামানোর জন্য ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, পাকিস্তান দেশটিকে ‘অন্যদের তুলনায় বেশি ভালো বোঝে’।
মূলত ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনেক সময় দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে জোরদার করেছে, যদিও তা মাঝে মাঝে টানাপোড়েনের মধ্যেও পড়েছে। ৯/১১-পরবর্তী ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ ন্যাটো বহির্ভূত মিত্র হলেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা আফগানিস্তানে জোট বাহিনীর ওপর হামলাকারী জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে।
২০১১ সালে পাকিস্তানের মাটিতে আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। সেটিও ইসলামাবাদকে না জানিয়েই করা হয়েছিল— এতে ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক আরও খারাপ হয় এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তালেবানকে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠে।
আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। আর এই চুক্তিিউভয় দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে, তবে একই সঙ্গে তেহরানকে সমর্থন দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলামাবাদের সীমাবদ্ধতাও তৈরি করে।
শেহবাজ শরিফ সম্প্রতি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করতে রিয়াদ সফর করেন। এছাড়া পাকিস্তানের বেইজিংয়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এএফপিকে বলেছেন, চীন হয়তো ইরানকে আলোচনায় আনতে সহায়তা করেছে।
গত মাসে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে সংঘাত কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। এরপর তিনি আরও আলোচনার জন্য বেইজিং সফর করেন। ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ বন্ধে পরিকল্পনার আহ্বান জানিয়েছে এবং বলেছে, পরিস্থিতি শান্ত করতে পাকিস্তানের ‘বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা’ রয়েছে।
মূলত নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়া পাকিস্তানের জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরমাণু অস্ত্রধারী এই দেশটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং একইসঙ্গে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়াও এড়াতে চাইছিল ইসলামাবাদ। কারণ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সরবরাহ যেমন ব্যাহত হতো, দামও বাড়ত এবং আর্থিক সংকটে থাকা পাকিস্তানের বর্তমান সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতো।
বিপরীতে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা যেমন বাড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পাকিস্তানের অবস্থান শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাত এবং ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।







