বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক জ্বালানির বহুমুখীকরণের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাগেরহাটের রামপালে দেশের বৃহত্তম ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। ৩৭৫.৯৪ কোটি টাকা আসবে বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে।
২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কেন্দ্রটিতে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রস্তাবিত ট্যারিফ ৬.১৮ টাকা।
ইতিমধ্যে এ-সংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে ২০১২ সালে বাগেরহাট জেলার রামপালে মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে বিপিডিবি। জমিটি দুটি ব্লকে বিভক্ত—ব্লক-এ ও ব্লক-বি। এর মধ্যে ব্লক-এ অংশে বাংলাদেশ-ভারত কয়লাভিত্তিক মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। ব্লক-বি অংশটি বর্তমানে বিপিডিবির অধীনে রয়েছে, যেখানে ভূমি উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তীতে বিদ্যুতের বিশেষ বিধান আইন ২০১০ (সংশোধিত ২০২১) বাতিল হলে সেই প্রক্রিয়া স্থগিত হয়।
পরে ২০২৫ সালে মে মাসে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি দ্বারা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। তাতে ৬৮৫ একর জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়নের অতিরিক্ত প্রয়োজন নেই, ফলে নির্মাণ ব্যয় কম হবে এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিট খরচ কমবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য পাওয়া সম্ভব হবে, যা সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে।
এদিকে গত ডিসেম্বরে ফেনীর সোনাগাজীতে ২২০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অভ বাংলাদেশ লিমিটেড (ইজিসিবি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
বিপিডিবির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রামপাল প্রকল্পের তুলনায় সোনাগাজী প্রকল্পটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি দক্ষ হলেও এর নির্মাণ ব্যয় ও ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। সোনাগাজী প্রকল্পের ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজেশন ফ্যাক্টর নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ শতাংশ, যা রামপাল প্রকল্পের ক্ষেত্রে ১৭ শতাংশ।
রামপাল প্রকল্পে প্রতি মেগাওয়াটে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫.৬৬ কোটি টাকা। সোনাগাজী প্রকল্পে এই খরচ ৬.২৭ কোটি টাকা। অবকাঠামো নির্মাণ খাতে সোনাগাজীতে ব্যয় রামপাল প্রকল্পের দ্বিগুণেরও বেশি। এছাড়া ডিজাইন, ইঞ্জিনিয়ারিং ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণেও সোনাগাজী প্রকল্পের ব্যয় অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।
ব্যয়বহুল নির্মাণ খরচের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্যের ওপর। রামপাল প্রকল্প থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬.১৮ টাকায় কেনার প্রস্তাব থাকলেও সোনাগাজী প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই ট্যারিফ ধরা হয়েছে ৮.৮৭ টাকা। অর্থাৎ সোনাগাজীর বিদ্যুতের দাম রামপালের তুলনায় প্রায় ৪৩ শতাংশ বেশি। সোনাগাজী প্রকল্প থেকে বার্ষিক ৩৮১.৫৪ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। রামপালে এ লক্ষ্যমাত্রা ৩৫২.৪১ কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন, রপ্তানিমুখী ডিজিটাল শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিকাশ, আইসিটি খাতে অগ্রগতি ও জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নের ফলে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টারপ্ল্যান ২০২৩ অনুযায়ী, ২০৩০, ২০৪১ ও ২০৫০ সালে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা যথাক্রমে ২৯ হাজার ২৫৭ মেগাওয়াট, ৫৮ হাজার ৫৯৭ মেগাওয়াট ও ৯৬ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। অথচ এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট (২৩ জুলাই ২০২৫)।
দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এলেও উৎপাদন সক্ষমতা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫ প্রণয়ন করেছে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ ও ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ মোট উৎপাদনের তুলনায় এখনও খুবই সীমিত। ফলে এই খাতে দ্রুত বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা উইং-এর অতিরিক্ত সচিব নূর আহমেদ বলেন, ‘রামপাল এলাকায় প্রস্তাবিত ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।’
প্রকল্পটির প্রস্তাব ইতিমধ্যে ডিপিপি আকারে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।






