যুদ্ধে কোন দেশ হারলো-জিতলো সেটা বড় নয়। বড় হচ্ছে পুরো বিশ্বই যেন বিপাকে পড়েছে যুদ্ধের কারণে। ইরানে মানুষ মরছে, সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। ইরানের পাল্টা আক্রমণে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য ।
এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, যাকে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের লাইফলাইন বলা হয়। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ প্রতিদিন এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যার পরিমাণ গড়ে ১৯ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে এশিয়া ও ইউরোপে জ্বালানি পৌঁছানোর জন্য এই প্রণালী অপরিহার্য, বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া-এর মতো বড় অর্থনীতিগুলোর জন্য। কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ পথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা তৈরি করেছে।

শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার জ্বালানি রেশনিং করছে। ফিলিপাইন পেট্রল ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। বিদ্যুৎ বাঁচাতে বাংলাদেশে সাময়িকভাবে বিদ্যালয়ে সশরীরে ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সারা ভারতেই দেখা যাচ্ছে, বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁয় গ্যাসের অভাবে কাঠের আগুনে রান্না হচ্ছে। এয়ারলাইনসগুলো উড়ান বাতিল করছে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানীবাহী ট্যাংকার চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক জাহাজ মাঝপথে আটকে পড়েছে, আবার কিছু জাহাজকে বিকল্প রুটে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে পরিবহন সময় ও খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে, সঙ্গে বীমা ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্যের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ডমিনো প্রভাব দেখা দিচ্ছে।

জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ থেকে ১৩০ ডলার প্রতি ব্যারেলের মধ্যে ওঠানামা করছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম উচ্চ পর্যায়। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ইতোমধ্যে ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল বাজারে পৌঁছাতে পারেনি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ জ্বালানি সংকটে ভোগছে
বর্তমানে বাংলাদেশে ৯০ দিনের নেট আমদানির সমপরিমাণ তেল মজুদ আছে যা দিয়ে জ্বালানি সমস্যা মোকাবিলা করা হচ্ছে।
এদিকে যুদ্ধের ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। সামরিক অভিযান, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং অবকাঠামো ধ্বংস মিলিয়ে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি ডলার পর্যন্ত খরচ হয়ে যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মাসে যুদ্ধ শুরুর মাত্র ছয় দিনের মাথায় তাদের ১ হাজার ১৩০ কোটি (১১.৩ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় হয়েছে।

এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্য ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। কৃষি উৎপাদন ব্যয় ও খাদ্য পরিবহন খরচ বাড়ায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ-এর মতো দেশগুলোর জন্য এটি বড় উদ্বেগের কারণ, কারণ তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে।







