ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের বিশাল ব্যয়ভার মেটাতে আরব দেশগুলোর কাছে অর্থ চাইতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস থেকে এমন একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এই যুদ্ধের খরচ ইতোমধ্যে কয়েক হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সোমবার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিটকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো এবারও আরব দেশগুলোর এই যুদ্ধের খরচ বহন করা উচিত কি না। সে সময় মার্কিন মিত্ররা ওয়াশিংটনের সামরিক অভিযানের বড় একটি অংশ অর্থায়ন করেছিল।
জবাবে লেভিট সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মনে হয় বিষয়টি নিয়ে প্রেসিডেন্ট বেশ আগ্রহী এবং তিনি তাদের (আরব দেশগুলোকে) এমন আহ্বান জানাতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলে আমি প্রেসিডেন্টের আগে যেতে চাই না। তবে আমি নিশ্চিতভাবে জানি যে এটি তার একটি ভাবনা। এ বিষয়ে খুব শীঘ্রই হয়তো তার কাছ থেকে আপনারা আরও বিস্তারিত শুনতে পাবেন।’
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে কুয়েতে ইরাকি আগ্রাসন ঠেকাতে কুয়েত এবং বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী আরব দেশের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক জোট গঠন করেছিল। সেই সময়ে যুদ্ধের খরচ মেটাতে ওই অঞ্চলের দেশগুলো এবং জার্মানি ও জাপানের মতো মিত্ররা মিলে ৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করে যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছিল, যা বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি অনুযায়ী প্রায় ১৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের সমান।
১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক জোট থাকলেও, এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের কোনো মিত্র বা আঞ্চলিক দেশকে সঙ্গে না নিয়েই একতরফাভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ডানপন্থী ভাষ্যকার শন হ্যানিটি চলতি মাসের শুরুর দিকে বলেছিলেন, যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ইরানকেই যুদ্ধের খরচ মেটানোর শর্ত থাকতে হবে। উল্লেখ্য, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় ২,০০০ ইরানি নিহত হয়েছেন। হ্যানিটির মতে, ‘এই পুরো সামরিক অভিযানের যাবতীয় খরচ ইরানকে তেলের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।’
তবে ইরান উল্টো দাবি করেছে , যুদ্ধের ফলে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তারা এটিকে যুদ্ধবিরতির অন্যতম শর্ত হিসেবে রেখেছে।
এদিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তারা অঞ্চলে থাকা মার্কিন সম্পদগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করছেন। তবে বাস্তবে তেহরান বেশ কিছু উপসাগরীয় দেশের হোটেল, বিমানবন্দর এবং জ্বালানি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন বেসামরিক স্থানেও হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক গোপন শুনানিতে কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে কংগ্রেস সদস্যদের জানানো হয়েছে যে যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই ১১৩০ কোটি (১১.৩ বিলিয়ন) ডলার খরচ হয়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএহআইএস)-এর হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতের ১২তম দিনে এই ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে ১ হাজার ৬৫০ কোটি (১৬.৫ বিলিয়ন) ডলারে পৌঁছায়।
এই পরিস্থিতিতে ইরানে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখা এবং পেন্টাগনের ফুরিয়ে আসা গোলাবারুদ পুনরায় মজুত করার জন্য হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে অন্তত ২০ হাজার কোটি (২০০ বিলিয়ন) ডলারের অতিরিক্ত সামরিক বরাদ্দ চেয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সরাসরি ব্যয়ের বাইরে এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে। মূলত ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পরই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রতি গ্যালন (৩.৮ লিটার) পেট্রলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৩.৯৯ ডলার। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের তুলনায় এটি ১ ডলারের বেশি।
সোমবার ক্যারোলিন লেভিট আবারও ট্রাম্প প্রশাসনের দাবির পুনরাবৃত্তি করে বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সাময়িক কষ্টের চেয়ে ইরানকে দুর্বল করার মাধ্যমে অর্জিত সাফল্য অনেক বড় হবে।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল বার্তাটি আমরা বারবার স্পষ্ট করেছি: যুক্তরাষ্ট্র, আমাদের সৈন্য এবং এই অঞ্চলের মিত্রদের ওপর ইরান যে হুমকি তৈরি করেছে তা চিরতরে বন্ধ করার সুদূরপ্রসারী সুফলের তুলনায় বর্তমানের এই সামরিক পদক্ষেপ এবং তেলের দামের ওঠানামা খুবই সাময়িক বিষয় মাত্র।’
অন্যদিকে ইরানের দাবি, কূটনৈতিক আলোচনা চলাকালীন তাদের ওপর আগে হামলা চালানো হয়েছে। তেহরানের ভাষ্যমতে, তারা যুক্তরাষ্ট্র বা এই অঞ্চলের জন্য কোনো হুমকি ছিল না।







