মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি ভিত্তিতে ৩ লাখ টন ডিজেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এই জ্বালানি সংগ্রহের মূল লক্ষ্য হলো দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আমদানিতব্য এই ৩ লাখ টন ডিজেলের মধ্যে দুবাইভিত্তিক পেট্রোগাস ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেশন সরবরাহ করবে ১ লাখ টন এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ অ্যান্ড এ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস বাকি ২ লাখ টন সরবরাহ করবে। গত ১২ মার্চ অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনকে এই জরুরি কেনাকাটার অনুমোদন প্রদান করেছে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বর্তমানে অনেক শিপিং কোম্পানি তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে নিয়মিত সরবরাহকারীরা সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে হিমশিম খেতে পারেন এমন আশঙ্কা থেকেই সরকার এই বিশেষ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে এপ্রিল মাসে দেশে বোরো সেচ মৌসুম এবং ঈদযাত্রার কারণে ডিজেলের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। এই সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে পরিবহন, কৃষি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসার ঝুঁকি রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে যে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আমদানিকৃত ডিজেলের প্রথম চালানটি আগামী ২৭ মার্চের মধ্যে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি মাসে গড়ে ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টন ডিজেলের প্রয়োজন হয়। এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে আগাম মজুত গড়ে তোলা না গেলে সেচ মৌসুমে ডিজেলের সামান্যতম ঘাটতিও জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে এই আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য কাঠামো নিয়ে কিছুটা ভিন্ন চিত্র এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে। দুবাইয়ের পেট্রোগাস ইন্টারন্যাশনাল থেকে সংগৃহীত ডিজেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজার দর বা প্ল্যাটস অনুযায়ী নির্ধারিত হলেও আমেরিকার এ অ্যান্ড এ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস প্রতি ব্যারেলে মাত্র ৭৫ ডলারের একটি নির্দিষ্ট মূল্য প্রস্তাব করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে ডিজেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১৪৩ থেকে ১৭২ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করলেও এই অস্বাভাবিক কম দামের প্রস্তাবটি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুত মূল্যে এবং সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারবে কি না সেদিকে কড়া নজর রাখছে জ্বালানি বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে এ অ্যান্ড এ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কর্তৃক সরবরাহকৃত ডিজেলটি সম্ভবত রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল থেকে উৎপাদিত যা চালানের আগে পশ্চিম এশিয়ার কোনো তৃতীয় দেশে পরিশোধিত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে লজিস্টিক বা কারিগরি কোনো জটিলতা তৈরি হয় কি না তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সরকারের এই কৌশলগত সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হলো যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রেখে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা।







