ইরান যুদ্ধের জেরে অস্থির বিশ্ব তেলবাজারকে শান্ত করতে বড় পদক্ষেপ নিল আমেরিকা। এই মুহূর্তে সমুদ্রপথে আটকে থাকা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ৩০ দিনের বিশেষ ছাড় দিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির জোগান স্বাভাবিক করতেই এই সিদ্ধান্ত।
এই ঘোষণার পরেই শুক্রবার সকালে এশিয়ার বাজারে তেলের দাম কিছুটা থিতিয়ে এসেছে। ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েয়েল হামালা এবং তার জবাবে তেহরানের পাল্টা আক্রমণে মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহ। আকাশছোঁয়া তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই পদক্ষেপ নিল।
বুধবারই ওয়াশিংটন ঘোষণা দিয়েছিল, দাম কমাতে তারা নিজেদের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত থেকে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়বে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ৩২টি সদস্য দেশ মিলিতভাবে যে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এটি তারই অংশ। এর আগে আইইএর বলেছিল, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ তেলের জোগানে ইতিহাসের বৃহত্তম সংকট তৈরি করেছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১২ মার্চের মধ্যে জাহাজে বোঝাই করা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য কেনাবেচা ও সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই ছাড় কার্যকর থাকবে ওয়াশিংটন সময় ১১ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত।
ইরান যুদ্ধের জেরে তেলের দাম বাড়লে মার্কিন জনসাধারণ ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। নভেম্বরেই দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন। কংগ্রেসে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া ট্রাম্পের রিপাবলিকান শিবির। তাই ভোট বৈতরণি পেরোতে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হোয়াইট হাউসের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমাজমাধ্যম এক্স-এ বিবৃতি দেন অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট। সেখানে তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ‘সুচিন্তিত’ ও ‘স্বল্পমেয়াদী’। এর ফলে রাশিয়ার কোষাগারে বড় কোনো আর্থিক সুবিধা পৌঁছাবে না।
ট্রাম্পের সুরে সুর মিলিয়েই বেসেন্টের দাবি, ‘তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতি সাময়িক। আমাদের দেশ ও অর্থনীতি এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে লাভবানই হবে।’
ফক্স নিউজের প্রতিবেদন অনুসারে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিশ্বের ৩০টি জায়গায় সমুদ্রে রাশিয়ার প্রায় ১২৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আটকে ছিল। আমেরিকার দেওয়া এই বিশেষ ছাড়ের ফলে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে তেলের যে বিপুল ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তার প্রায় পাঁচ-ছয় দিনের জোগান নিশ্চিত করা যাবে।
নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার এ পদক্ষেপে বিশ্ববাজারে তেলের জোগান বাড়লেও ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়ার আর্থিক পথ রুদ্ধ করার পশ্চিমা প্রচেষ্টাকে তা জটিল করে তুলতে পারে। এমনকি এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের মতান্তর হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
জি-৭ রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনার পর ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেছেন, রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উপযুক্ত সময় এটি নয়।
অন্যদিকে রাশিয়ার বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ জানিয়েছেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট নিয়ে ফ্লোরিডায় মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে। ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
উল্লেখ্য এর আগে গত ৫ মার্চ ভারতকেও সমুদ্রে আটকে থাকা রুশ তেল কেনার ক্ষেত্রে ৩০ দিনের বিশেষ ছাড় দিয়েছিল মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়।
পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত করতেও সক্রিয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সামুদ্রিক বাণিজ্যে বিমা ও আর্থিক নিরাপত্তা দিতে তিনি ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্স কর্পোরেশনকে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনে মার্কিন নৌসেনা পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে পাহারা (এসকর্ট) দেবে বলেও জানানো হয়েছে।
তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে জোন্স অ্যাক্ট নামক একটি নিয়মও সাময়িকভাবে শিথিল করার কথা ভাবছে হোয়াইট হাউস। এই নিয়ম শিথিল হলে বিদেশি জাহাজগুলো আমেরিকার এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে সহজেই জ্বালানি ও কৃষিপণ্য পৌঁছে দিতে পারবে, যা পরিবহন খরচ কমাতে সাহায্য করবে।
হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অভ স্টাফ স্টিফেন মিলার ফক্স নিউজের এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তেলের দাম কমাতে প্রেসিডেন্ট সম্ভাব্য সব রকম পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং আগামী দিনে এ ধরনের আরও সিদ্ধান্ত দেখা যাবে।
যদিও যুদ্ধের কারণে তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে আমেরিকার আর্থিক লাভের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্পের এক মন্তব্যে নতুন বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট কেবল ধনকুবেরদের স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত।
২০২২ সালের পর এই প্রথম বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। দু-সপ্তাহ আগে ইরানের ওপর আক্রমণ চালানোর পর থেকেই তেলের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম বাড়ায় রাশিয়ার দৈনিক আয় ইতিমধ্যেই প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আমেরিকার এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ক্রেমলিনের রাজকোষ যে আরও স্ফীত হবে, তা বলাই বাহুল্য।
প্রদা/ডিও







