দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উচ্চ সুদহারের কারণে জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন ৬.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন এবং ব্যাংকগুলোও ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের ৬.১ শতাংশ থেকে জানুয়ারিতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যেখানে এই হার ছিল ১০.১৩ শতাংশ, সেখান থেকে ক্রমেই তা উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে এসেছে।
নভেম্বরে ঋণ প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে বেড়ে ৬.৫৮ শতাংশে উঠেছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি উৎপাদনমুখী খাতে নতুন বিনিয়োগের ফল নয়; বরং ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে ঋণ পুনঃতফসিলের প্রভাবেই এমনটা হয়েছিল।
জানুয়ারি–জুন ২০২৬ মেয়াদের মুদ্রানীতি ঘোষণায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, কঠোর মুদ্রানীতি, বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের বাড়তি ঋণ গ্রহণ এবং নতুন বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়াই প্রবৃদ্ধি হ্রাসের প্রধান কারণ।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ৬.২৯ শতাংশ, আগস্টে ৬.৩৫ শতাংশ, জুলাইয়ে ৬.৫২ শতাংশ, জুনে ৬.৪০ শতাংশ, মে মাসে ৭.১৭ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৭.৫ শতাংশ।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.১৩ শতাংশ। তবে ওই বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পালাবদলের পর তা দ্রুত কমতে শুরু করে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যবসায় আস্থার ঘাটতি এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করেছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পেলেও অনেক ব্যবসায়ী এখনো সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন।
এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে ও অর্থনীতিতে গতি আনতে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংক খাতের উচ্চ সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বন্ধ শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান চালু করে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর ওপর জোর দেন তিনি।
তার বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি থেকে সরে আসতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে বড় কারণগুলোর একটি হলো ব্যাংক থেকে সরকারের বাড়তি ঋণ গ্রহণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার প্রায় ৪৩ শতাংশ।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণ ৩২.৮ শতাংশ বেড়েছে। ফলে তারল্য সংকটের মধ্যে বেসরকারি খাত কার্যত চাপের মুখে পড়েছে।
এদিকে ব্যাংকগুলো রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বকেয়া ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতি দুর্বল হয়েছে, সংরক্ষণ (প্রভিশনিং) বাড়াতে হয়েছে এবং নতুন ঋণ অনুমোদনে ব্যাংকগুলো আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে।
তারল্য সংকট ও আমানত প্রবৃদ্ধি ধীরগতির হওয়ায় ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা আরও কমেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগেই নীতিসুদ ১০ শতাংশে উন্নীত করে। ফলে বাণিজ্যিক ঋণের সুদহার প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছায়, যা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নতুন ঋণ নেওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করছে।
দুর্বল ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, যা শিল্প খাতে মন্থরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় অর্থের সঞ্চালনও হ্রাস পেয়েছে। অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করছে, ভোক্তা চাহিদা নিম্নমুখী এবং বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও কমে গেছে।
জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৯.৮ শতাংশ। তবে বাস্তবে প্রবৃদ্ধি হয়েছ সে লক্ষ্যের তুলনায় অনেক কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণ প্রবৃদ্ধি দ্রুত ঘুরে না দাঁড়ালে শিল্প উৎপাদন আরও দুর্বল হতে পারে, বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবিরই থেকে যেতে পারে এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে।
প্রদা/ডিও







