জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সাম্প্রতিক সরবরাহ সংকটে চাপের মুখে থাকা বাজারে এতে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত মিললেও খুচরা পর্যায়ে এর প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। ভোক্তাদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যেই সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ১ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে প্রায় ৯১ হাজার টন এলপিজি দেশে এসেছে। জানুয়ারির একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৬৩ হাজার টন—অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। এর বাইরে সীতাকুণ্ডের বেসরকারি জেটিগুলোর মাধ্যমে মাসে আরও ২০ থেকে ২২ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়ে থাকে।
খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হয়। ফলে আমদানিকারকেরা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকেছেন। নতুন চালানের একটি অংশ ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে এবং বাকিগুলো মার্চের প্রথমার্ধে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এতে সরবরাহ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হতে পারে বলে আশা করছেন তারা।
তবে ঢাকাসহ চট্টগ্রামের বাজারে এখনো ১২ কেজির সিলিন্ডার ১,৬০০ থেকে ১,৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি। কোথাও কোথাও দাম ১,৮০০ থেকে ২,৫০০ টাকায়ও পৌঁছেছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা পরিবেশকদের কাছ থেকেই বেশি দামে সিলিন্ডার সংগ্রহ করছেন, ফলে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে পরিবেশকদের দাবি, আগের মাসগুলোর কম আমদানির প্রভাব এখনো কাটেনি।
বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন–এর সভাপতি আমিরুল হক গণমাধ্যমকে জানান, বর্তমান আমদানির পরিমাণ বিবেচনায় বড় ধরনের ঘাটতির কথা বলা ঠিক নয়। তার মতে, আমদানিকারকেরা নির্ধারিত মূল্যে পণ্য ছাড়লেও খুচরা পর্যায়ে এসে দাম বাড়ছে। তিনি বলেন, বিকল্প উৎস থেকে আমদানি শুরু হওয়ায় দ্রুত সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
অন্যদিকে এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটরস অ্যাসোসিয়েশন–এর নেতারা বলছেন, শহরাঞ্চলে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ কম। সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী বাড়তি দাম নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত বছরের নভেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের আমদানি হ্রাস এবং অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতায় ডিসেম্বর-জানুয়ারিতেও স্বাভাবিক গতি ফেরেনি। একই সময়ে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়, যা বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমদানি বাড়ানোর অনুমতি দিলে ফেব্রুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি দেখা যায়।
নতুন করে প্রায় ১০ হাজার টন ধারণক্ষমতার কয়েকটি ট্যাংকার ইতোমধ্যে দেশের বন্দরের পথে রয়েছে। বড় আমদানিকারকেরা একাধিক জাহাজে করে অতিরিক্ত এলপিজি আনছেন। খাতসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই চালানগুলো পৌঁছালে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং দামও কমতে শুরু করবে।
বর্তমানে দেশে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। পুরো বাজারই বেসরকারি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। নিবন্ধিত বহু কোম্পানি থাকলেও সক্রিয় আমদানিকারকের সংখ্যা তুলনামূলক কম, ফলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপরই সরবরাহের বড় অংশ নির্ভর করে।
এদিকে মূল্য নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে মাঠপর্যায়ে সেই মূল্য কার্যকর হচ্ছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তারা। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালালেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারে স্থিতিশীলতা আসছে না বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আমদানি বাড়লেও সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে সমন্বয় না হলে খুচরা পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি মিলবে না। ধারাবাহিক আমদানি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে—এমন আশাই এখন সংশ্লিষ্টদের।
প্রদা/ডিও






