দেশের অর্থনীতি বর্তমানে “কঠিন ও স্থবির” অবস্থায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, “দারিদ্র্য বাড়ছে, কমছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—এমন প্রেক্ষাপটে কাঠামোগত সংস্কার, অংশগ্রহণমূলক বাজেট এবং আস্থাভিত্তিক পুঁজিবাজার গড়ে তোলাই হবে সরকারের অগ্রাধিকার।”
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের মেহেদীবাগে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। নতুন সরকারের মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম চট্টগ্রাম সফর। অর্থমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে তার বাসভবনে নেতাকর্মীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
শেয়ারবাজারে ‘কসমেটিক’ নয় বরং স্থায়ী পরিবর্তন আনা হবে জানিয়ে আমীর খসরু বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে সূচক বৃদ্ধিকে তিনি স্বাগত জানান, তবে এটি “কসমেটিক”। তার মতে, এটি হয়তো গণতান্ত্রিক সরকারের প্রত্যাশায় সৃষ্ট আস্থার প্রতিফলন। তবে এই সাময়িক উত্থান দিয়ে বাজার স্থায়ীভাবে জাগ্রত হবে না।
পূর্ণাঙ্গ পরিবর্তনের জন্য আইন-কানুন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় সংস্কার প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)–এর ভূমিকা শক্তিশালী করা হবে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কোনো ধরনের আপস না করার নীতি নেওয়া হবে। ভালো ও লাভজনক কোম্পানিকে বাজারে আনা, দেশি-বিদেশি ফান্ড আকৃষ্ট করা এবং বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। এসব বাস্তবায়িত হলে শুধু পুঁজিবাজার নয়, সার্বিক শিল্প-বাণিজ্য, রপ্তানি ও উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দ্রব্যমূল্যে স্থিতিশীলতা আসবে।
বাজেটে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গতানুগতিক ধারায় বাজেট প্রণয়ন করা হবে না। এমন বাজেট দেওয়া হবে, যেখানে বাংলাদেশের সব নাগরিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সমান সুযোগ পাবেন।
“পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি আর চলবে না”—উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতদিন বিশেষ একটি গোষ্ঠী সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করেছে। নতুন বাজেটের লক্ষ্য হবে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং একটি সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দারিদ্র্য বৃদ্ধির সূচক, বিনিয়োগ হ্রাস, কর্মসংস্থানের সংকোচন এবং বেসরকারি খাতে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ার মতো বিভিন্ন নির্দেশক বর্তমান অর্থনীতির দুর্বলতাকে স্পষ্ট করছে। প্রাইভেট সেক্টর ঋণ গ্রহণ কমিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতি কঠিন পরিস্থিতির মুখে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে ‘ডিরেগুলেশন’ ও ‘লিবারালাইজেশন’-এর মাধ্যমে অর্থনীতিকে মুক্ত করা হবে। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা ‘ওভার-রেগুলেশন’-এর কারণে কিছু গোষ্ঠী পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ নিয়েছে—এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাই হবে সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য।’
ঋণের চাপ ও পাচার হওয়া অর্থ প্রসঙ্গ টেনে আমীর খসরু বলেন, ‘বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হলেও তা অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় না হয়ে লুটপাটে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে যে সম্পদ বাস্তবে নেই, তার দায় এখন বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। সামনে ঋণ পরিশোধের বড় চাপ রয়েছে। তবে জি-টু-জি (সরকার থেকে সরকার) পর্যায়ে আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক পেশাদার প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।’
চট্টগ্রামের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন কার্যক্রম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলবে, তবে সব প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হবে। সব মিলিয়ে নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হবে—আস্থা পুনর্গঠন, স্বচ্ছ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে স্থবির অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা।’
এর আগে সকালে আকাশপথে চট্টগ্রাম হযরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। বিমানবন্দরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বন্দরের কার্যক্রম আরও উন্নত করা এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এখন বাণিজ্যিক রাজধানীর কাজ শুরু হবে। এখানে বিনিয়োগের অনেক বড় ব্যাপার আছে, সেদিকে আমাদের যেতে হবে। পোর্টের কার্যক্রম আরও উন্নততর করতে হবে। বিনিয়োগের মাধ্যমেই তো বাণিজ্যিক রাজধানীর স্বপ্ন সফল হবে।’







