‘জুলাইযোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দিতে অধ্যাদেশ অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ।বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল এ কথা জানান।
আইন উপদেষ্টা বলেন, আমাদের জুলাই গণভ্যুত্থানকারীদের প্রতি কমিটমেন্ট ছিল, নতুন বাংলাদেশ নির্মাণে আমাদের যে প্রত্যয় ছিল, কমিটমেন্ট ছিল—জুলাই গণভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা অধ্যাদেশ উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
আগামী পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে গেজেট জারির মাধ্যমে এই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা হবে জানান তিনি।আসিফ নজরুল বলেন, এখানে আমরা মূলত যেটা করেছি সেটা হচ্ছে জুলাই গণভ্যুত্থানকালে রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সংগঠিত কার্যাবলী থেকে গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিরোধ বলতে আমরা বুঝিয়েছি—ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংগঠিত সে সমস্ত কার্যাবলীর ফৌজদারি দায়-দায়িত্ব থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি। এটা হচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাই এবং আগস্টে সংগঠিত কার্যাবলী।
আইন উপদেষ্টা বলেন, যদি কোনো মামলা হয়ে থাকে জুলাই গণভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সংগঠিত কার্যাবলীর কারণে যদি কোনো ফৌজদারি মামলা হয়ে থাকে তাহলে সেই মামলাগুলা প্রত্যাহার করার পদক্ষেপ সরকার নেবে এবং এখন থেকে নতুন কোনো মামলা করা যাবে না।আসিফ নজরুল ব্যাখ্যা করে বলেন, এখন প্রশ্ন আসবে বা আসতে পারে—কোন হত্যাকাণ্ড আপনার রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রক্রিয়ায় হয়েছে আর কোন হত্যাকাণ্ড ব্যক্তি এবং সংকীর্ণ স্বার্থে করা হয়েছে বা এটার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিরোধের সম্পর্ক নেই।এটা নির্ধারণের দায়িত্ব আমরা দিয়েছি মানবাধিকার কমিশনকে। কোনো ভিকটিমের পরিবার যদি মনে করে, তার বাবা বা তার ভাই বা কোনো স্বজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে অন্য কারও ব্যক্তিগত সংকীর্ণ স্বার্থ থেকে, এটার সঙ্গে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের সম্পর্ক ছিল না, তাহলে তিনি মানবাধিকার কমিশনে যাবেন।
মানবাধিকার কমিশন যদি দেখে, সত্যি এটা ব্যক্তিগত সংকীর্ণ স্বার্থে করা হয়েছে তাহলে মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করবে। তদন্ত রিপোর্ট দেবে।তিনি বলেন, আদালতে সেই তদন্ত রিপোর্টই পুলিশের তদন্ত রিপোর্টের মত করে গণ্য করা হবে। যদি দেখেন যে—না, এটা রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সংগঠিত কার্যাবলীর ধারাবাহিকতায় হয়েছে। তাহলে অবশ্যই এই সংগঠিত কার্যক্রমের জন্য কোনো দায়-দায়িত্ব থাকবে না।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান।জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে, ওই অভ্যুত্থানকালে নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের গুলিসহ বিভিন্ন সংঘাতে ১৪০০ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সেসময় অভ্যুত্থানকারীদের প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমেও কিছু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
সম্প্রতি হবিগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসানসহ একাধিক জুলাইযোদ্ধা গ্রেপ্তার হওয়ার প্রেক্ষাপটে তাদের অভ্যুত্থানকালীন প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের দায়মুক্তির দাবি ওঠে।
এরপর গত ৮ জানুয়ারি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া স্ট্যাটাসে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, জুলাইযোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে মুক্ত করেছিল। অবশ্যই তাদের দায়মুক্তির অধিকার রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার (লেলিয়ে দেওয়া) খুনিদের বিরুদ্ধে তারা যে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম করেছিল সেজন্য তাদের দায়মুক্তি দিয়ে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনও রয়েছে।
তিনি সেসময় বলেন, এ ধরনের আইন প্রণয়ন সম্পূর্ণ বৈধ। আরব বসন্ত বা সমসাময়িককালে বিপ্লব (বা গণঅভ্যুত্থানে) জনধিকৃত সরকারগুলোর পতনের পর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের দায়মুক্তির আইন হয়েছে।বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে দায়মুক্তির আইনের বৈধতা রয়েছে এবং ১৯৭৩ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দায়মুক্তি আইন হয়েছিল।