চট্টগ্রাম ও আশপাশের অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী ৯ আগস্টের সফর। চট্টগ্রাম সফরে এসে তিনি মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ও মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন। এরপর চট্টগ্রামের বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থনীতির দৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে মাতারবাড়ী। গভীর সমুদ্রবন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার তথ্য অনুযায়ী, মাতারবাড়ী বন্দর প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে দেশের পণ্য পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে লজিস্টিকস সংযোগ উন্নত করা।
মাতারবাড়ী ঘিরে বদলাতে পারে বাণিজ্যের চিত্র
বর্তমানে দেশের অধিকাংশ কনটেইনার পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিবহন করা হয়। জাইকার মূল্যায়নে, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও নাব্যতার কারণে ভবিষ্যতের বাণিজ্য চাহিদা মোকাবিলায় নতুন গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রয়োজন রয়েছে। মাতারবাড়ী সেই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে বড় আকারের জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশের বন্দরে আসার সুযোগ বাড়বে। এতে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানিকারকদের লজিস্টিকস ব্যয় কমতে পারে। জাইকার একটি কৌশলগত মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে উন্নত লজিস্টিকস ব্যবস্থা তৈরি হলে রপ্তানি পণ্যের লিড টাইম কমতে পারে এবং বাংলাদেশের উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে।
এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর মাতারবাড়ী পরিদর্শনকে শুধু একটি প্রকল্প পরিদর্শন হিসেবে না দেখে বৃহত্তর অর্থনৈতিক করিডর, শিল্পায়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রামে শিল্পায়নের নতুন দুয়ার
মাতারবাড়ীর পাশাপাশি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চনের কাজও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠতে যাওয়া এ শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন এবং ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণ থেকে আসবে।
প্রকল্পটির লক্ষ্য চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল তৈরি করা। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, শিল্পাঞ্চলটি প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে এবং এক লাখের বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল এবং আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিল্প, বন্দর, গুদামজাতকরণ, পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় দাবিতে উঠে আসতে পারে গ্যাস ও শিল্পাঞ্চল
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে ফটিকছড়ির স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কয়েকটি অর্থনৈতিক দাবি সামনে আনার প্রস্তুতি নিয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ তৈরি, চা ও রাবারবাগানে গ্যাস সংযোগ এবং খাসজমিতে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার দাবি রয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা এবং চট্টগ্রাম থেকে নাজিরহাট হয়ে রামগড় পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের দাবিও রয়েছে। এসব বাস্তবায়িত হলে উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য এলাকার সঙ্গে বন্দরনগরীর যোগাযোগ বাড়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও শিল্প বিনিয়োগের সুযোগও বাড়তে পারে।

বন্যা পুনর্বাসনেও অর্থনৈতিক প্রভাব
প্রধানমন্ত্রীর সফরের আরেকটি কর্মসূচি রয়েছে বাঁশখালী ও হাটহাজারীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিয়ে। বাঁশখালীতে ১০০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে নতুন ঘর দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। হাটহাজারীতেও ৩০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এ ধরনের পুনর্বাসন কর্মসূচি সরাসরি বড় অর্থনৈতিক প্রকল্প না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বসতি ও জীবিকা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের দরিদ্র ও জেলে পরিবারের পুনর্বাসন হলে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে জিয়াউর রহমানের সময়ের প্রভাব
চট্টগ্রামের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক নয়; তাঁর শাসনামলে দেশের অর্থনীতির কাঠামো পরিবর্তনের যে নীতিগুলো নেওয়া হয়েছিল, তার প্রভাব পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের শিল্প ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতেও পড়ে।
জিয়াউর রহমানের সময় অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়। শিল্পে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। তাঁর সরকারের ১৯ দফা কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য ছিল দ্রুত আর্থসামাজিক উন্নয়ন।
বিশেষ করে শিল্প ও বাণিজ্যে বেসরকারি খাতের ভূমিকা বাড়ানোর নীতি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও তাঁর সময়ের সঙ্গে যুক্ত। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চট্টগ্রাম ইপিজেড ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর। তাই এটিকে তাঁর আমলে প্রতিষ্ঠিত বলা সঠিক নয়; বরং তাঁর সরকারের নেওয়া শিল্প ও রপ্তানিমুখী নীতির ধারাবাহিকতার সঙ্গে এর প্রতিষ্ঠার সম্পর্ক রয়েছে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম ইপিজেড দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি কেন্দ্র। বেপজার তথ্য অনুযায়ী, এটি ১৯৮৩ সালে দেশের প্রথম ইপিজেড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে আমদানি-রপ্তানিতে সময় ও ব্যয় কমানোর সুবিধা পায়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ অঞ্চল বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
অতীতের অর্থনৈতিক নীতি থেকে বর্তমানের চট্টগ্রাম
আজকের চট্টগ্রামের অর্থনীতি মূলত তিনটি বড় শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে—বন্দর ও লজিস্টিকস, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প পার্ক এবং নতুন যোগাযোগ অবকাঠামো।
আগামীকালের প্রধানমন্ত্রীর সফরে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও মহেশখালীর উন্নয়ন কার্যক্রম সরেজমিনে দেখার বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ এসব প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম শুধু দেশের প্রধান বন্দরনগরী নয়, বরং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক একটি বড় শিল্প ও লজিস্টিকস হাবে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, চট্টগ্রাম ইপিজেড, বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর্ণফুলী টানেল ও মাতারবাড়ী বন্দর—এসব প্রকল্পকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক বলয়ের আওতায় আনা গেলে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হবে।







