দেশের অধিকাংশ শীর্ষ বাণিজ্যিক ব্যাংক আগস্টের শুরু থেকেই আমানতের সুদহার ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়েছে। এতে ব্যাংকে টাকা রেখে যে মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে, তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় আরও পিছিয়ে পড়েছে। ফলে আমানতকারীদের প্রকৃত রিটার্ন এখন ঋণাত্মক হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, ব্যাংক খাতে বর্তমানে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও দুর্বল। ফলে নতুন করে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে। এ কারণেই ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার কমানোর পথে হাঁটছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত পরিবর্তনের পর আমানত ও ঋণের সুদহারে সমন্বয় শুরু হয়েছে। প্রায় দুই বছর পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। পাশাপাশি আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান বা স্প্রেড সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাবে ব্যাংকগুলো ঋণের পাশাপাশি আমানতের সুদহারও কমিয়ে আনছে।
তবে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সঞ্চয়কারীদের ওপর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, জুনে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর বিপরীতে নতুন করে সুদহার কমানোর পর অনেক ব্যাংকে আমানতের সুদহার ৮ দশমিক ৫০ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে নেমে আসতে পারে। অথচ জুলাইয়ে বিভিন্ন ব্যাংকে এই হার ছিল প্রায় ৯ থেকে ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ।
অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার আমানতের সুদের চেয়ে বেশি থাকায় ব্যাংকে টাকা রেখে যে মুনাফা পাওয়া যাবে, প্রকৃত অর্থে তার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে আমানতের প্রকৃত সুদহার নেতিবাচক থাকার পর নতুন এই সমন্বয় সঞ্চয়কারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ব্যাংকিং খাতের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ। ব্যাংকারদের মতে, আগের সময়ে তুলনামূলক আকর্ষণীয় সুদহার দেওয়ার কারণে আমানত সংগ্রহে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি উঁচু থাকা অবস্থায় সুদহার আরও কমে গেলে ভবিষ্যতে মানুষ ব্যাংকে সঞ্চয় করতে আগ্রহ হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তবে ব্যাংকারদের মতে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলেও বর্তমানে অনেক আমানতকারী বেশি মুনাফার চেয়ে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ কারণে আমানতের প্রবাহ আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মে মাসে ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
শুধু আমানতের সুদ কমানোই নয়, ব্যাংকগুলোর আয়ের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। ট্রেজারি বিল ও সরকারি বন্ডের মুনাফা কমে যাওয়া এবং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ও ঋণ—দুই ক্ষেত্রেই আগের মতো আয় হচ্ছে না।
ব্যাংকারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ট্রেজারি বিলের মুনাফা ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ট্রেজারি বন্ডের সুদও ১০ শতাংশের সামান্য ওপরে, যেখানে আগে তা প্রায় ১২ শতাংশ ছিল। ফলে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকেও ব্যাংকগুলোর প্রত্যাশিত রিটার্ন কমেছে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি মন্থর থাকায় ঋণের চাহিদাও কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় ব্যাংকগুলোর সুদ আয়েও এর প্রভাব পড়ছে।
গত কয়েক বছরে ব্যাংকগুলোর আয়ের কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২১ সালে দেশের ৫২টি প্রধান ব্যাংকের মোট আয়ের পরিমাণ ছিল ৪০ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। ওই সময় মোট আয়ের ৪৭ শতাংশ এসেছিল ঋণ থেকে, ৩৪ শতাংশ বিনিয়োগ থেকে এবং ১৯ শতাংশ কমিশন থেকে।
তবে ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলোর আয়ের চিত্র অনেকটাই বদলে যায়। ওই বছর বিনিয়োগ আয় ব্যাংকগুলোর মোট আয়ের সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত হয়। মোট আয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ আসে বিনিয়োগ থেকে। বিপরীতে নিট সুদ আয়ের অংশ কমে দাঁড়ায় মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশে।
২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে ট্রেজারি বিল ও সরকারি বন্ডের মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এসব সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়িয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব বিনিয়োগের রিটার্ন কমে আসায় ব্যাংকগুলোর আয়ের কাঠামোতেও নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য, বেসরকারি খাতে ঋণের দুর্বল চাহিদা এবং সরকারি সিকিউরিটিজের কমে যাওয়া মুনাফা—এই তিন কারণে আমানতের সুদহার কমানোর প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে। এতে ব্যাংকের তহবিলের ব্যয় কমলেও মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সঞ্চয়কারীদের প্রকৃত রিটার্ন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।







