চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনের তপশিল এখনো ঘোষণা হয়নি। তবে তপশিল ঘোষণার আগেই বন্দর নগরীতে শুরু হয়েছে নির্বাচনী উত্তাপ। জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের গণসংযোগ, মতবিনিময় সভা ও রাজনৈতিক তৎপরতায় নগরজুড়ে তৈরি হয়েছে নির্বাচনী আবহ। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত কাউন্সিলরবিহীন ৪১টি ওয়ার্ডের নাগরিক সেবা চলায় এবারের নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশনও (ইসি)। গত ১৫ জুলাই নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন শাখা-৩ থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়। সময়সূচি অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দাবি-আপত্তি গ্রহণ, ২৩ আগস্টের মধ্যে তা নিষ্পত্তি এবং ২৭ আগস্ট সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। কমিশনের এই কার্যক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়। বর্তমানে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন ডা. শাহাদাত হোসেন। ইতোমধ্যে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন তপশিল ঘোষণা করলে মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করে আবারও নির্বাচনে অংশ নেবেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি। ওই নির্বাচনে (নিষিদ্ধ ঘোষিত) আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বিজয়ী হন। পরে নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন বিএনপির প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল রেজাউল করিম চৌধুরীর নির্বাচন বাতিল করে ডা. শাহাদাত হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র ঘোষণা করেন। একই বছরের ৩ নভেম্বর তিনি মেয়র হিসেবে শপথ নেন।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে। বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমানকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা। আদালতের রায়ে মেয়রের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও বর্তমান অবস্থানের কারণে ডা. শাহাদাত হোসেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কারণে নাজিমুর রহমানও দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমি মেয়র পদে নির্বাচন করব। দলের সিদ্ধান্ত সবসময় মেনে চলেছি, ভবিষ্যতেও মেনে চলব। একইসঙ্গে চট্টগ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চাই। নগরের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে ট্রাফিক ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা ও জনভোগান্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, ফুটপাত দখলসহ নাগরিক সমস্যাগুলো সমাধানে নগরবাসীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে চাই।’
এদিকে বিএনপির বাইরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আলোচনার বড় জায়গা দখল করে আছেন সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম। ২০১০ সালের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনের সামাজিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসায়ী মহলে গ্রহণযোগ্যতা এবং নগর রাজনীতিতে পরিচিতির কারণে এখনো সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার নাম আলোচনায় রয়েছে। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা মোহাম্মদ মনজুর আলম ২০১০ সালে বিএনপির সমর্থনে মেয়র নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি আলোচনায় আসেন। একসময় তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নগরীতে সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়ানোর পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে দলটি। ইতোমধ্যে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী নিয়ে কাজ শুরু করেছে জামায়াত। বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ, মতবিনিময় সভা, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক কর্মসূচির মাধ্যমে নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
মেয়র পদে জামায়াত ইতোমধ্যে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর শামসুজ্জামান হেলালীর নাম ঘোষণা করেছে। তিনি ২০১০ সালের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ষোলশহর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেন।
এনসিপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে দলীয় পর্যায়ে কয়েকটি নাম নিয়ে আলোচনা রয়েছে। শুরুতে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমকে দলে এনে মেয়র প্রার্থী করার বিষয়ে আলোচনা ছিল বলে জানা গেছে। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নগর আহ্বায়ক ও বর্তমান যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিনের নামও আলোচনায় আসে। এছাড়া চট্টগ্রাম-৮ আসনের সাবেক প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশের আলোচনায় রয়েছে। তবে মেয়র পদে চূড়ান্ত প্রার্থী কে হচ্ছেন, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়নি এনসিপি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলও নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেছে। সুন্নিপন্থি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দলও নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতি ও কৌশল নির্ধারণ করছে। এসব দল এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে, নাকি কোনো সমঝোতার মাধ্যমে প্রার্থী দেবে এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না থাকলেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তারা।
মেয়র পদের পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচন নিয়েও সরব হয়ে উঠেছে নগরীর রাজনৈতিক অঙ্গন। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় ওয়ার্ড পর্যায়ের নাগরিক সেবা কার্যক্রমে নানা সীমাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা কাউন্সিলর পদে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।







