পরীক্ষায় যে ফলাফল পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল আশানুরূপ ফলাফল তারা পাননি এবং এক্ষেত্রে শিক্ষকের ব্যক্তিগত আবেগ, রাগ, অনুরাগ ভূমিকা রেখেছে। ক্যাম্পাসে পরীক্ষায় ফলাফলের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী।
শনিবার (৩০ আগস্ট) অনলাইনে আঁচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘বৈষম্যের শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য’ শীর্ষক সমীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশের তথ্যে এ চিত্র উঠে আসে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট সায়েদুল ইসলাম সাঈদ, ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের আইনজীবী হাবিবুর রহমান, পার্সপেক্টিভের নির্বাহী সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ সিবগা, জুলাই অ্যাক্টিভিস্ট জাহিদ হাসান এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্যের সম্যক অবস্থা বুঝতে আঁচল ফাউন্ডেশন একটি জরিপ পরিচালনা করার উদ্যোগ নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রিসার্চ টিমের সদস্যরা মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর জরিপটি পরিচালনা করেন। সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষার্থীরা অনলাইন ফর্ম পূরণের মাধ্যমে জরিপটিতে অংশগ্রহণ করেন এবং তাদের মতামত জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈষম্য হলো এমন একটি অবস্থা বা আচরণ যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অন্যদের তুলনায় কম মূল্যায়ন বা অবহেলা করা হয় এবং তাদেরকে প্রাপ্য সমান সুযোগ, অধিকার বা সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। এটি নানা কারণে হতে পারে, যেমন: লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ, অর্থনৈতিক অবস্থা, শারীরিক বা মানসিক সক্ষমতা, সামাজিক অবস্থা ইত্যাদি। পড়াশোনাকালীন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। এর ফলে অনেকের মাঝেই নানারকম মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। এর তীব্রতা বেড়ে গেলে একসময় শিক্ষার্থীদের মাঝে বিষণ্ণতা তৈরি হয় এমনকি কখনো কখনো আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়।
জরিপে মোট ১ হাজার ১৭৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মাঝে নারী শিক্ষার্থী ছিলেন ৫৬.৬ শতাংশ, পুরুষ শিক্ষার্থী ৪৩.১ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ০.৩ শতাংশ। তাদের মাঝে ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ছিলেন ৩৬.৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ছিল ২৩ থেকে ২৬ বছর বয়সের শিক্ষার্থী, যা ৫৮.১ শতাংশ। ২৭ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৪.৩ শতাংশ এবং ৩০ বছরের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেন ০.৯ শতাংশ।
অংশগ্রহণকারীদের ৪৯.৩ শতাংশ ছিলেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ১৯.৬ শতাংশ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ২২ শতাংশ, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ৩.৪ শতাংশ এবং পলিটেকনিকের ১.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী।
বৈষম্যের শিকার ৪১.৯ শতাংশ শিক্ষার্থী
অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে ৪১.৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে তাদের নানাভাবে এবং বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে হয়। তাদের মাঝে ৫১ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৪৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হন তৃতীয় এবং চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা, যা প্রায় ৪০ শতাংশ করে। বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের মাঝে ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। প্রায় ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন এবং ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী মেডিকেল কলেজের রয়েছেন। জরিপে দেখা যাচ্ছে, বৈষম্যের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষ এবং নারী শিক্ষার্থী উভয়ের অবস্থানই কাছাকাছি।
বৈষম্যের ধরন
শিক্ষার্থীরা জানান তারা ক্যাম্পাস জীবনে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান তারা পরীক্ষায় ফলাফলের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। এছাড়া, ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ধর্মীয় কারণে তার সাথে অন্যায্য আচরণ করা হয়েছে। শারীরিক অক্ষমতার জন্য বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ শিক্ষার্থীকে।
জাতিগত পার্থক্যের কারণে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছেন ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। ভিন্ন জাতির হওয়ায় অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। অর্থনৈতিক কারণে প্রায় ২৩ শতাংশ, শারীরিক অবয়বের কারণে ২৯ শতাংশ এবং রাজনৈতিক মত পার্থক্যের কারণে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীর বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে।
যে মাধ্যমে বৈষম্যের শিকার
শিক্ষার্থীরা জানান, সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, যা মোট হিসেবের ৬০ শতাংশ। ১৯ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বা ডর্মিটরিতে এবং ৩৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইভেন্টে।
৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন বন্ধু-বান্ধবদের আড্ডায় তাদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন প্রায় ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর। এর বাইরে লাইব্রেরি, ক্যাফে, পরীক্ষার হলেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষার্থী।
বৈষম্যের শিকার হওয়ার পর মানসিক প্রতিক্রিয়া
বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের ৯০ শতাংশই মানসিক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছেন। এদের মাঝে ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন এ ধরনের আচরণের প্রভাব তাদের উপর গুরুতরভাবে পড়েছে, মোটামুটি প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ৬.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন কোনো প্রভাব পড়েনি।
যে ধরনের প্রভাব পড়েছে
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন তাদের মাঝে মানসিক সমস্যার বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ দেখা গিয়েছে। ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বিষণ্ণতার লক্ষণ অনুভব করছেন, উদ্বিগ্নতা অনুভব করেছেন ৪৯ শতাংশ, ঘুমের সমস্যা তৈরি হয়েছে ৩০ শতাংশের মাঝে। ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তাদের মাঝে প্যানিক অ্যাটাকের তীব্রতা বেড়েছে, স্ট্রেস বা চাপ অনুভব করছেন ৪৭ শতাংশ। ৪৩ শতাংশ একাকিত্ব অনুভব করেছেন এবং ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান তারা হীনমন্যতায় ভুগছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বৈষম্যের শিকার
৩১ শতাংশ শিক্ষার্থীকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয়েছে। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৪৮.০৫ শতাংশ এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৫০.৬৫ শতাংশ। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন তাদের কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
যার মাধ্যমে বৈষম্যের শিকার
শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন সহপাঠীদের দ্বারা। যার সংখ্যা প্রায় ৫৮ শতাংশ। শিক্ষক কর্তৃক এ ধরনের আচরণের শিকার হতে হয়েছে ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে দায়ী করেছেন। প্রায় ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দায়ী করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ
মানসিক সমস্যা তৈরি হলেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের প্রতি শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উদাসীন থাকেন। বৈষম্যের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, যেমন- কাউন্সেলিং, থেরাপি ইত্যাদির শরণাপন্ন হয়েছেন। অবশিষ্ট ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থীই জানিয়েছেন তারা কোনো ধরনের সেবা গ্রহণ করেননি। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের পর তাদের সমস্যা প্রশমিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ না করার কারণ
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ না করার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন শিক্ষার্থীরা। ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তারা মানসিক সেবা সম্পর্কে ঠিকমতো ধারণা রাখেন না। সামাজিক ট্যাবু বা লজ্জার কারণ ভেবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেননি বলে জানিয়েছেন ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। সেবা কোথা থেকে নিতে পারবেন সে বিষয়ে জানেন না বলে জানিয়েছেন ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে সেবা গ্রহণ করেননি ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী।
মনোযোগ কমছে শ্রেণিকক্ষে
ক্লাস ও পড়াশোনার মনোযোগেও ব্যাঘাত ঘটছে শিক্ষার্থীদের মাঝে মানসিক সমস্যা তৈরি হওয়ার কারণে । ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, তারা ঠিকমতো ক্লাসে যোগ দিতে ব্যর্থ হন। ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন ক্লাসে অংশ নিতে পারলেও প্রায়ই পড়াশোনায় মনোযোগ থাকে না তাদের।
প্রশাসনিক পদক্ষেপ অপ্রতুল
বৈষম্যের শিকার হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে ৭৫ শতাংশই জানান যে, তারা কোনো ধরনের অভিযোগ দেননি। অভিযোগ দেওয়ার পর প্রশাসন সঠিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন ১১ শতাংশ শিক্ষার্থী। ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় সহায়তা করলেও তাদের পদক্ষেপ ছিল অকার্যকর। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা সহায়ক ছিল না বলে জানিয়েছেন ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যাপ্ত কি না
বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পর্যাপ্ততা নেই। মাত্র ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা রয়েছে। ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সেবা নেই।
আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ ফাউন্ডেশনের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে মেন্টরিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া; ছয় মাস অন্তর শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং করা; বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধে মনিটরিং টিম গঠন ও কঠোর আইন প্রয়োগ; প্রতিটি বিভাগে অভিযোগ বক্স রাখা ও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কমপ্লেইন সেল গঠন।
এছাড়াও, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা; উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থান দিকনির্দেশনায় ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেন্টার চালু; সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা।
প্রদা/ডিও