বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে সমুদ্রতলের সম্পদ।
বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে সমুদ্রতলের সম্পদ। এ সম্পদের সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণকে ঘিরে ব্যাপক মাত্রায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানি, সামুদ্রিক ঠিকাদার ও প্রযুক্তি স্টার্টআপগুলো। এখান থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের আয় তুলে নেয়ার পরিকল্পনা করছে তারা। খবর এফটি।
ইউরোপের সবচেয়ে বড় জাহাজ নির্মাতা ফিনকান্তিয়েরির পূর্বাভাস অনুসারে, বিশ্বব্যাপী সমুদ্রের তলদেশকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও প্রতিরক্ষা ব্যবসার আকার বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি ইউরো বা ৫ হাজার ৮৩৪ কোটি ডলার করে বাড়তে পারে। ইতালির রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি আন্ডারওয়াটার বিভাগ সম্প্রতি এ খাত থেকে তাদের আয়ের লক্ষ্য বাড়িয়েছে। আগামী দুই বছরে ফিনকান্তিয়েরির আয় দ্বিগুণ হয়ে ৮২ কোটি ইউরোয় পৌঁছতে পারে।
সমুদ্রতলের গ্যাস পাইপলাইন ও টেলিযোগাযোগ কেবল অপরিহার্য অবকাঠামো হিসেবে চিহ্নিত। গত কয়েক বছরে এ ধরনের স্থাপনায় হামলার প্রবণতা বেড়েছে। এ কারণে পানির নিচের সম্পদ রক্ষায় সামরিক পরিকল্পনাবিদদের আরো বেশি মনোযোগ দিতে হচ্ছে।
পানির নিচের অবকাঠামো সুরক্ষায় সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) সাবমেরিন কেবল সম্পর্কিত নিয়ম কঠোর করেছে। অন্যদিকে সামরিক সক্ষমতা নিয়ে সর্বশেষ কৌশলগত পর্যালোচনায় সমুদ্রতলের নিরাপত্তাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখিয়েছে যুক্তরাজ্য।
ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের নৌযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ সিড কৌশল বলেন, ‘পানির নিচের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকা এবং তুলনামূলকভাবে দুর্লভ লক্ষ্যবস্তু অনুসরণ, এটা নৌবাহিনীর কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু নতুন কিছু হুমকি এখন বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কেবল ও পাইপলাইন অবকাঠামোর ওপর হামলা কিংবা কার্গো জাহাজে আক্রমণ। এসব ক্ষেত্রে প্রচলিত সমুদ্রতলের যুদ্ধপদ্ধতি অকার্যকর ও ব্যয়সাপেক্ষ।’
তিনি আরো বলেন, ‘এক্ষেত্রে আসল চ্যালেঞ্জ হলো হুমকির মাত্রা কত বড় তা নির্ধারণ করা। সেই পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামরিক সক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো যায় সেটাই হলো মূল বিষয়।’
প্রতিরক্ষা খাতে বিশ্বের শীর্ষ কোম্পানি বিএই সিস্টেমস ও থেলিস, আল্ট্রা মেরিটাইমের মতো মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান এবং হেলসিংয়ের মতো স্টার্টআপগুলো এখন যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।
সমুদ্রতল নিয়ে ন্যাটোর নতুন উদ্যোগ ডিজিটাল ওশান ভিশন। এর লক্ষ্য হলো স্যাটেলাইট থেকে শুরু করে স্বয়ংক্রিয় নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে সাগরের নিচে, ওপরে ও পৃষ্ঠে ঘটে যাওয়া ঘটনা আরো ভালোভাবে মূল্যায়নের সক্ষমতা বাড়ানো। বড় আকারের এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে এরই মধ্যে আগ্রহ দেখিয়েছে প্রতিরক্ষা খাতের অনেক কোম্পানি।
বিএই সিস্টেমসের আন্ডারওয়াটার ওয়েপনস বিভাগের প্রধান ডেভ কুইক বলেন, ‘পানির নিচে কাজ করার চ্যালেঞ্জ অনেক। চরম এ পরিবেশে গভীরতা, পানির চাপ, জটিল শব্দতরঙ্গ ও অসীম বিস্তৃতি সবকিছুই প্রযুক্তিগত সিস্টেমের জন্য ভয়ানক চ্যালেঞ্জ।’
কোম্পানির নির্বাহীরা বলছেন, মাইক্রো ইলেকট্রনিকস ও চালকবিহীন প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং বেসামরিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য সমুদ্রতলে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে।
পানির তলে ব্যবহারযোগ্য নৌযানের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমসাবস। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ব্রেট ফেন্যুফ বলেন, ‘উচ্চ ক্ষমতার কম্পিউটিং সিস্টেম ও মাইক্রো ইলেকট্রনিকসের প্রসার ও খরচ সাশ্রয়, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং প্রসেসিং সক্ষমতায় এমন কিছু সম্ভব হয়েছে যা আগে কল্পনার বাইরে ছিল।’
সাবমারজেন্স গ্রুপের মালিকানাধীন প্লাইমাউথভিত্তিক এমসাবস সম্প্রতি রয়্যাল নেভির জন্য বড় আকারের চালকবিহীন সাবমেরিন তৈরি করেছে। এক্সক্যালিবার নামের পরীক্ষামূলক যানটি ১২ মিটার লম্বা, ২ দশমিক ২ মিটার ব্যাস ও ১৯ টন ওজনের।
থেলিস ইউকের আন্ডারওয়াটার সিস্টেম বিভাগের বিক্রয় পরিচালক ইয়ান ম্যাকফারলেন বলেন, ‘আমরা কয়েকটি ক্ষেত্রে এক ধরনের মোড় ঘোরানো মুহূর্তে পৌঁছেছি। সেন্সরসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশগুলোর আয়তন ছোট করার পাশাপাশি চালকবিহীন প্লাটফর্মগুলোয় উন্নতি হয়েছে। ফলে আপনি ছোট সেন্সর ব্যবহার করে প্রচুর যান পানিতে নামাতে পারবেন।’
দীর্ঘদিন ধরে সোনার সিস্টেম সরবরাহকারী থেলিস এখন রয়্যাল নেভির আসন্ন প্রজেক্ট চ্যাবট নিয়ে আগ্রহী। এর আওতায় চালক ও চালকবিহীন যানবাহনের সমন্বয়ে বহর তৈরি হবে, যা অ্যান্টি-সাবমেরিন যুদ্ধে সক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে। এর লক্ষ্য হলো পানির নিচের ড্রোন ব্যবহার করে শব্দতরঙ্গের তথ্য সংগ্রহ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য হুমকি শনাক্তকরণ।
পানির নিচের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি। এ কারণে দীর্ঘ গবেষণার দাবি জানিয়ে বিএই সিস্টেমসের কর্মকর্তা ডেভ কুইক বলছেন, ‘পানির নিচের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ভুল বা ব্যর্থতার সুযোগ নেই। কারণ একদিনও যদি সিস্টেম ঠিকমতো কাজ না করে, তবে সেটা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।’
স্টার্টআপগুলোও এখন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্প্রসারণে আগ্রহী। এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় স্টার্টআপ হেলসিং ও মার্কিন কোম্পানি অ্যান্ডুরিল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্রিটিশ শাখা অ্যান্ডুরিল ইউকে।
গত মাসে হেলসিং জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্লাইমাউথে একটি কারখানা করবে তারা। যেখানে তৈরি হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত চালকবিহীন গ্লাইডার এসজি-১ ফাথোম। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাত্র একজন অপারেটর শত শত গ্লাইডার পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন, যা প্রচলিত চালকনির্ভর অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার প্যাট্রলের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ ব্যয়ে পানির নিচ থেকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করবে।
আগামী ১২ মাসের মধ্যে এ সিস্টেম কার্যকর করার পরিকল্পনা করেছে হেলসিং। আন্ডারওয়াটার ড্রোন গ্রুপ ব্লু ওশান মেরিন টেক সিস্টেমস, সামুদ্রিক রোবট খাতের বিশেষজ্ঞ কোম্পানি ওশান ইনফিনিটি ও এফটিএসই ২৫০ তালিকাভুক্ত প্রতিরক্ষা গ্রুপ কাইনেটিকের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে।
অন্যদিকে ব্রিটিশ কোম্পানি সোনারডাইন ও আল্ট্রা মেরিটাইমের সঙ্গে মিলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সাবমেরিন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা সিবেড সেন্ট্রি তৈরি করেছে অ্যান্ডুরিল।
প্রদা/ডিও